আহমদ ছফার দৃষ্টিতে রাজনীতির আলোকে বাংলা ভাষা

যে সমস্ত বাংলার পন্ডিতেরা মাঠে-ময়দানে বাংলা ভাষার স্বপক্ষে বিস্তর চিল্লাচিল্লি করেন, তাদের ছেলেমেয়েদের ইংরেজি স্কুলে পড়াশোনা করতে পাঠান। এমনও দেখা গেছে,  জুচ্চোর ঠিকেদার, চূড়ান্ত সমাজ বিরোধী, কালোবাজারি, শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রতি যাঁদের একফোঁটা অনুরাগ নেই তারাও ছেলেমেয়েদের ইংরেজি স্কুলে পাঠাচ্ছে। ইংরেজ শাসন নেই অথচ ইংরেজির প্রসার বাড়ছে _এর কারন কি? 

‘বাংলাভাষা: রাজনীতির আলোকে’ আহমদ ছফার প্রবন্ধ সমগ্রে মোট চারটি প্রবন্ধ সংকলিত  হয়েছে। চারটি প্রবন্ধের মধ্যে প্রথম প্রবন্ধের বিষয়বস্ত হচ্ছে ‘বাংলাভাষা রাজনীতির আলোকে’। ছফাসাবের দৃষ্টিতে রাজনীতির আলোকে বাংলা ভাষার দিকে আলোকপাত করলে দেখা যায় তিনি বলেন, 

‘বাংলা ভাষা চালুর কর্মসূচির সঙ্গে সে রাজার দুধের দীঘি খনন করার গল্পটির সঙ্গে তুলনা করা যায়। রাজা একবার ভাবলেন একটা দীঘি খনন করিয়ে রাজ্যের সমস্ত প্রজার কাছে নির্দেশ দিবেন স্বেচ্ছায় এক এক ঘটি বিশুদ্ধ গোদুগ্ধ তারা যেন দীঘিতে ঢেলে দেয়। রাই কুড়িয়ে বেল। এমনি করে  সকলের দানে সমৃদ্ধ হয়ে দুগ্ধের ধবল সরোবর থলথল করে জেগে উঠবে।

পরদিন সকালে প্রথম জন ভাবল অন্য সকলে খাঁটি দুধই নিয়ে যাবে, অতএব আমি এক ঘটি জল নিয়ে যায় না কেন। লক্ষ লক্ষ ঘটি খাঁটি দুধের সঙ্গে আমার একঘটি জল পরম নির্বিবাদে মিশে থাকতে পারবে। অত আর দেখে কে? ঐ রাজ্যের সকলে মহামানব ছিল কিনা বলতে পারব না, ঐ এক নম্বর প্রজার মতো ভেবেছিল। বাংলাভাষা চালুর প্রহসনও  মোটামুটি একই রকম। তবে মাঝে মাঝে দুমূর্খের আক্ষেপ শোনা যায়, বাংলাভাষায় কোন জ্ঞানগর্ভ বই প্রকাশিত হচ্ছে না। সুতরাং বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করে একটি অকাট মূর্খ যদি থেকে যেতে হয় তার চাইতে একেবারে পড়াশোনা না করাই ঢের  উত্তম।

আজকের বাংলাদেশের জনগণকে ভাষা এবং সংস্কৃতিগতভাবে বিচার করলে দুটি সুস্পষ্ট ভাগে ভাগ করা যায়। একদল সবদিক দিয়ে ঔপনিবেশিক শাসনে-শোষণে উৎপীড়িত এবং লাঞ্ছিত হয়েছেন। অন্যদল  ঔপনিবেশিক শোষণের ফলে লুট করার সুবিধে পেয়েছেন। যাঁরা উৎপীড়িত হয়েছেন, তাদের মুখের ভাষা আদিম যুগের বাংলা ভাষায় থেকে গেছে, এখনো সেই ভাষা তাদের মুখে মুখে জীবিত রয়েছে। আর যাঁরা ঔপনিবেশিক সরকারের সহায়তা করেছেন তারা শিক্ষা- দীক্ষার অধিকারী হবার সুযোগ পেয়েছেন। নিজেদের মুখের ভাষা আধুনিক ছাঁচে ঢালাই করার  যাবতীয় প্রয়োজনীয় সুবিধা লাভ করেছেন। এইভাবেই  ব্রিটিশ শাসনের পক্ষপুটে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীটির সৃষ্টি। তাঁরা শহর কলকাতা এবং কলকাতা শহরের আশেপাশের মানুষের কথ্যবুলিকে লেখ্যভাষায় উন্নীত করে তা বাংলাভাষা-ভাষীর একমাত্র ভাষা হিসেবে চালু করতে সক্ষম হয়েছেন।

প্রকৃত গণমুখী শিক্ষা, বাংলাভাষার মাধ্যমে সকল স্তরে সকল বিষয়ে শিক্ষাদান, সকল সরকারি বেসরকারি কর্মে মাতৃভাষার ব্যবহারের জন্য সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক এবং সামাজিক আন্দোলনের প্রয়োজন অপরিহার্য। সেই আন্দোলনের লক্ষ্য হবে সকল শোষিত এবং নির্যাতিত মানুষকে অর্থনৈতিক  দাসত্ব থেকে মুক্তি প্রদান, অতীতের ঔপনিবেশিক সরকারের কাছ থেকে যে শ্রেণীবিভক্ত সমাজ বাংলাদেশের মানুষ উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছে এবং বিদেশী শোষকদের স্থলে সাম্রাজ্যবাদী সম্প্রসারণবাদী শক্তির সহায়তায় শোষণ করে যাচ্ছেন। সেই  শ্রেণীভিত্তিক সমাজকে সম্পূর্ণরূপে ভেঙে ফেলা এবং শোষিত মানুষের সাংস্কৃতিক চেতনার মান উন্নত করে তাদের সামনে একটি সমৃদ্ধ সমাজের ছবি তুলে ধরা; যাতে করে এই পচা ঘুনে ধরা সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার জন্য শরীরে মনে পূর্ণ প্রস্তুতি তারা গ্রহণ করতে পারেন।

গায়ের জোরে, অর্থনৈতিক নিষ্পেষণে একটি জাতির ভাষাকে ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব _যদি না আপনার থেকে সানন্দে সে ভাষা বর্জন করতে স্বীকৃত হয়। একেকটি ভাষা একেকটি  জাতির চিন্ময় সত্তাকেই ধারণ করে। জাতির জাগরণের প্রথম   স্পন্দনও ভাষার শরীরেই অনুভূত হয়। ধর্মীয় গোড়ামী, সামাজিক জাড্যতা,কূর্মবৃত্তি, কূপমুণ্ডুকতা, অর্থনৈতিক পশ্চাদপদতা, সাংস্কৃতিক অনগ্রসরতা ইত্যাদি যে সকল অনড়-স্থবির বন্ধন জাতিকে বৃক্ষের মত অচল এবং প্রণোচ্ছাসহীন করে রাখে সেগুলোর বিরুদ্ধে ভাষাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে।  অতীতের এবং বর্তমানের যে ভাষাগুলো মনন ও চিত্তসম্পদে সমৃদ্ধ বলে বিবেচিত হয়ে থাকে সেগুলোর  একটা পর্যায়ে ভাষাকে সামাজিক সংগ্রামের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ‘ 

সুতরাং, জাতির বাংলাভাষাকে সকল ক্ষেত্রে প্র‍য়োগের ক্ষেত্রে যথেষ্ঠ সদিচ্ছার প্র‍য়োজন রয়েছে।

লেখক, শিহাব উদ্দিন
শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়