বাংলার কোটি মানুষ হত্যার অপর নাম ‘ফারাক্কা বাধ’ 

লেখক, সিহাব উদ্দীন

ফারাক্কা বাধের কথা মাথায় আসলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ‘সোনার বাংলা সার্কাস’ ব্যান্ডের গানের লিরিক্স, “এ যেনো মৃত্যু উৎপাদন কারখানা…”

ফারাক্কা বাধ নিয়ে বাংলার গণবুদ্ধিজীবী আহমদ ছফা তার ‘বাংলার সার্বভৌমত্ব এবং ফারাক্কার রাজনৈতিক প্রেক্ষিত’ প্রবন্ধে যে ভবিষ্যৎবাণী করে গেছেন তার জ্বলন্ত প্রতিফলন আমরা দেখতে চলেছিলাম। 

‘ইতিহাসের কোন পর্যায়ে বাঙালিরা একটা স্বাধীন রাষ্ট্রযন্ত্রের মালিক হতে পারেনি। ফারাক্কা, ইত্যাদির প্রশ্নে তপ্ত বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে এই কথাগুলো বললাম। আমাদের দেশের জ্ঞানীগুণী অনেকেই পত্র-পত্রিকায় মতামত প্রকাশ করেছেন যে ট্রানজিট সুবিধা দিয়ে ফারাক্কার পানির একটা ব্যবস্থা আমাদেত করে ফেলা উচিত। প্রতিবেশীর সাথে বিবাদ- বিসম্বাদ আপসে মিটিয়ে ফেলাই প্রকৃষ্ট পন্থা। এটা হল আদর্শের কথা। কিন্তু আদর্শ ও বাস্তবতা প্রায় সময়ই  এক হয় না। ভারত যখন গত দুই যুগ গঙ্গার পানি একতরফা প্রত্যাহার করে বাংলাদেশে জাহান্নাম সৃষ্টি করেছিল, এই ভদ্রলোকেরা তার বিরুদ্ধে একটি কথা উচ্চারণ করেননি। আজকে যখন ভারত ট্রানজিটের বদলে পানি বিনিময় করার প্রস্তাব দিয়েছে, সকলে সোচ্চার হয়ে বলছেন ভারতের সঙ্গে আমাদের একটা মিটমাট করে ফেলা দরকার। মিটমাট অত্যন্ত ভালো জিনিস। কিন্তু কিসের বিনিময়ে ভারত আমাদের দেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিট চায়, চট্টগ্রাম বন্দরের সুযোগ-সুবিধা দাবি করে, এই কথাটি আজকে হঠাৎ করে অগ্রাধিকার পেল কেমন করে। উত্তর অত্যন্ত সরল। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিট না পেলে পূর্ব-ভারতের অশান্ত রাজ্যগুলো তার নিয়ন্ত্রণে রাখা অসাধ্য না হলেও দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে না পারলে তার ক্রমসম্প্রসারমান শিল্প পণ্যের রপ্তানি সম্ভব নয়। বাংলাদেশে পাকাপোক্তভাবে একটি মধ্যস্বত্বভোগী মুনাফালোলুপ ব্যবসায়ী শ্রেণী তৈরি করতে না পারলে ঠিক ১৩ হাজার কোটি টাকার এই বাজারটির উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। এই সকল কারণে ভারত বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিট দাবি করছে। কথাটিকে ঘুরিয়ে বললে এরকম দাঁড়ায় এই ট্রানজিট, বন্দর এবং বাজার সুবিধা আদায় করার অস্ত্র হিসেবে আগেভাগে ঠান্ডা মাথায় অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ফারাক্কা সংকটটির জন্ম দিয়েছে। পানি বাংলাদেশের প্রাণস্বরূপ। এই প্রাণের অস্ত্র প্রয়োগ করে বাংলাদেশকে ভারতীয়  দাবির কাছে নতজানু করানো যাবেএই চিন্তা সে দীর্ঘদিন ধরে লালন করে আসছে।

যদি ভারত বাংলাদেশের মধ্যদিয়ে মালামাল প্রেরণ করার জন্য রেলপথ সুবিধা গ্রহণ করে এবং বন্দর ব্যবহার করার অধিকার লাভ করে একটা সময় তার স্বার্থে আঘাত লাগলে এখানে সৈন্য পাঠাবে না, সেই গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে? 

বাংলাদেশের জনগণের একাংশ কে আরেক অংশের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেয়ার কাজটি এত সন্তর্পণে এবং সুকৌশলে করে যাচ্ছে সেই জিনিসটি উপলব্ধি করার মত মেধা এবং দূরদৃষ্টি বাংলাদেশের অতীতের শাসকদের যেমন ছিল না  বর্তমান শাসকদের আছে তেমন মনে করার কোনো কারণ নেই। আজকে ফারাক্কা, ট্রানজিট, বন্দর সুবিধা যে সকল কথা উঠে আসছে সেসবের সঙ্গে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি  এবং ভারতের অতীত আচরণের প্রেক্ষিতটি বিচার না করে কোন বিষয়েই স্থির সিদ্ধান্ত জাতির পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হলে সেটা হবে এই জাতির ১৮ কোটি মানুষের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হত্যার নামান্তর।’

শিক্ষার্থী রাবি

তথ্যসূত্র: শান্তিচুক্তি ও নির্বাচিত নিবন্ধ – আহমদ ছফা